আজ বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৭:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
«» নাচোলে বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগীতার উদ্বোধন হয়েছে «» চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা জাসদের উদ্দ্যোগে বিভিন্ন দাবিতে গণমিছিল ও সমাবেশ «» বাংলাদেশ ফুটবল দলকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা «» শিশু তুহিনের হ’ত্যাকারী বাবার পক্ষে কোনো আইনজীবী লড়বেন না «» বেনাপোল কাস্টম হাউস এখন জয় জয় ধ্বনিতে মুখরিত «» যশোরের শার্শায় এইডস সচেতনতায় করনীয় শীর্ষক আলোচনা সভা «» নাচোলে প্রতিবন্ধি শিশুকে হুইলচেয়ার প্রদান করলেন ইউএনও «» সিরাজগঞ্জ সদরে যমুনায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ মাছ ধরার অপরাধে ০৭ জেলের কারাদন্ডঃ «» গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে র‌্যালি «» ভোলাহাটে স্বর্ণকাপ ফুটবল প্রতিযোগীতা উদ্বোধন

অ্যাপিলেপসি ও ম্যালেরিয়া নিরাময়ে বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়

অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম ডক্টোরেট অব সায়েন্স প্রাপ্ত নারী।

অসীমা চট্টোপাধ্যায় একজন ভারতীয় রসায়নবিদ। জৈব রসায়ন ও ফাইটোমেডিসিনে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্যে খ্যাতি লাভ করেছেন। তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির মধ্যে আছে ভিংকা অ্যালকালয়েড নিয়ে রিসার্চ এবং মৃগী রোগ ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরি করা। ভারতীয় উপমহাদেশের ঔষুধি গাছ নিয়ে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।

অসীমার জন্ম ১৯১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, কলকাতায়। তিনি মৃত্যুবরণও করেন কলকাতায়, ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর।

তার বাবা ছিলেন মেডিকেল ডাক্তার ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায় এবং মা কমলা দেবী। দুই সন্তানের মধ্যে অসীমা ছিলেন বড়। তার বেড়ে ওঠা কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে যেখানে পড়াশুনার ব্যাপারে সবসময়ই তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তার বাবা ছিলেন অপেশাদার কেমিস্ট। বোটানি’র ব্যাপারে আগ্রহ অসীমা বাবার কাছ থেকেই পান।

অসীমা খুব ভালো ছাত্রী ছিলেন। ১৯৩০-এ ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালকাটা’র স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে রসায়নে অনার্স করেন, ১৯৩৮-এ জৈব রসায়নে মাস্টার্স এবং ১৯৪৪-এ ডক্টোরাল ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ডক্টোরেট অব সায়েন্স লাভ করা প্রথম ভারতীয় নারী।
সে সময় তার উল্লেখযোগ্য অধ্যাপকদের মধ্যে ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং সত্যেন্দ্র নাথ বোস। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন, ম্যাডিসন এবং ক্যালটেক ইউনিভার্সিটি’তে গবেষণার অভিজ্ঞতা আছে তার। তার ডক্টোরাল রিসার্চের মূল বিষয় ছিল প্ল্যান্ট প্রোডাক্টস এবং সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি। অসীমার এই প্রাকৃতিক উপাদান কেন্দ্রিক কাজকর্মের ফলাফল অ্যান্টি-এপিলেপটিক, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল এবং কেমোথেরাপির ওষুধ তৈরি।

তিনি ‘মারসিলিয়া মিনুটা’র মধ্যে অ্যান্টি-এপিলেপটিক আচরণ লক্ষ্য করেন। এবং অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল আচরণ দেখতে পান ‘অ্যালস্টোনিয়া স্কলারিস’, ‘সোয়ার্শা চিরাটা’, ‘পিক্রোরিজা কোরা’ এবং ‘সিজালপিনিয়া ক্রিস্টা’র মধ্যে। এই উদ্ভিদগুলি নিয়ে গবেষণা করে সফলভাবে আয়ুশ-৫৬ নামে একটা অ্যান্টি-অ্যাপিলেপসি ওষুধ এবং অসংখ্য অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ তৈরি করেন তিনি।

কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ফাউন্ডিং হেড হিসেবে অসীমা ১৯৪০ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালকাটা’র লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে সম্মানজনক খায়রা প্রফেসরশিপ পদে নিযুক্ত হন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন তিনি।

মেডিসিন কেমিস্ট্রি ফিল্ডে অসীমা চট্টোপাধ্যায় অনেক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। বিশেষত অ্যালকালয়েড, কিউমারিন, টার্পিনয়েড, অ্যানালিটিক কেমিস্ট্রি এবং মেকানিস্টিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি’তে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক জার্নালগুলিতে প্রায় ৪০০ গবেষণাপত্র ছাপান তিনি।

তার প্রকাশিত গবেষণাগুলিপত্রগুলি অনেক বেশি বার উল্লেখিত এবং পড়া হয়েছে। এমনকি তার কাজের অনেক কিছু পাঠ্য বইয়েরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অসীমা কলকাতা ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ‘ভারতীয় বনৌষধি’র ৬টি খণ্ড’ই সম্পাদনা ও সংশোধন করেন। এবং সিএসআইআর কর্তৃক প্রকাশিত সিরিজ ‘দ্য ট্রিটিজ অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন প্ল্যান্টস’-এরও চিফ এডিটর হিসেবে কাজ করেন।

আজকে অসীমা জনপ্রিয় ইন্ডিয়ান প্ল্যান্ট নিয়ে করা গবেষণাগুলির কারণে। এমন সব ব্যবহার খুঁজে বের করতে পারার কারণে যা কিনা ক্যান্সার, ম্যালেরিয়া, অ্যাপিলেপসি এবং চোখ ব্যথার মতো ছোট ছোট সমস্যাও সারাতে পারবে। তার মহাগ্রন্থ ‘দ্য ট্রিটিজ অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন প্ল্যান্টস’ নতুন গবেষণার জন্য আজও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর ৫ খণ্ডে সংস্কৃত নামসহ সব ভারতীয় ওষুধের নাম আছে।

মেডিসিনে তার যুগান্তকারী অবদান পৃথিবী জুড়ে ইউনিভার্সিটিগুলিতে স্বীকৃত হয়েছিল। ভারতীয় সরকার কর্তৃক অনেকবার প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। বিশেষত সবচেয়ে সম্মানজনক জাতীয় পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’ এবং একই সাথে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে নিযুক্ত হবার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সহযোগিতা এবং শেখানোতে বিশ্বাসী ড. অসীমা চ্যাটার্জি লেডি ব্রাবোর্নে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। একটা রিসার্চ ইন্সটিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে তিনি নিজে অনেক উদীয়মান কেমিস্ট্রি স্কলারদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

১৯৫৪ সালের দিকে তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পিওর কেমিস্ট্রি পড়ছিলেন। এই শিক্ষার্থী হওয়ার পরিচয়টা তিনি সবসময় দিতেন। সেই দিনগুলিতে উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার জন্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির তেমন কিছুই ছিল না। কাজ করাটা তখন অনেক কঠিন ছিল, একমাত্র দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেই কিছু করা সম্ভব হতো, নইলে না।

সেই কঠিন সময়গুলিতে তাকে উৎসাহ দিয়েছেন প্রফেসর সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা, এস. কে মিত্র, বি. সি. গুহ, স্যার জে. সি. ঘোষ এবং কলকাতা ইউনিভার্সিটির অন্যান্য ভাইস চ্যান্সেলররা। তার স্বামী ফিজিক্যাল কেমিস্ট এবং বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল প্রফেসর বরদানন্দ চট্টোপাধ্যায় দৃঢ়ভাবে তার পাশে থেকেছেন সবসময়।

অসীমা অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন। দিনের পর দিন নিবিড় মনোযোগ, সময়, মেধা ও ধৈর্য্য দিয়ে গবেষণা করে গেছেন। কাজ করে কখনোই সন্তুষ্ট হতেন না তিনি এবং কখনোই কাজের মান নিয়ে আপোস করেননি।

তিনি বলতেন, “আমি যতদিন বাঁচব কাজ করে যেতে চাই।” সারাজীবন এই দর্শন এবং ওয়ার্ক কালচার নিয়েই তিনি এত অসাধারণ এবং নিজের ভালো লাগার কাজগুলি করে গেছেন।

কভারের ছবি. পরিমল গোস্বামীর তোলা অসীমা চট্টোপাধ্যায়, সাল ১৯৫২

#ইতিহাস #নারী

error: Content is protected !!